#কাহারবা_তালের_কথা
মানবদেহে যেসব তাল স্বভাবতই বেজে ওঠে তার একটি হলো কাহারবা। যে কখনো গান শেখেনি সেও অবচেতনভাবে এই তাল ব্যবহার করে। সমপদী ও সরল প্রকৃতির জন্য কাহারবা সহজে শেখা যায়। আধাশাস্ত্রীয় সংগীত, আধুনিক গান, কাওয়ালী, ভজন-কীর্তন, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, বাউল— কোথায় নেই কাহারবা। পাশ্চাত্য সংগীতের বড় সংখ্যক জনপ্রিয় গান ৪।৪ বিট (কাহারবায়) রচিত। আফ্রিকা, ল্যাতিন আমেরিকা থেকে শুরু করে প্রায় সব জাতি উপজাতির মধ্যে কাহারবা বিস্তৃত। তবে ভারতীয় উপমহাদেশে কাহারবার ব্যবহার সবচেয়ে সুন্দর এবং এর বৈচিত্র্যময় অসংখ্য রূপ আছে। স্থানভেদে একে কাহার্বা, কাহেরবা, কার্ফা, keherwa, kaharwa ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ক্ষেত্রে যেখানে ধীর লয়ে ৪-৪ ছন্দের জন্যে ত্রিতাল ব্যবহৃত হয় সেখানে লঘু সঙ্গীতের ক্ষেত্রে ৪-৪ ছন্দের জন্যে কাহারবা জনপ্রিয়। দ্রুত গতিতে ত্রিতাল বাজালেও কাহারবার মতই শোনায়৷ কাহারবায় গানের সংখ্যা অসংখ্য হওয়ায় বড় তালিকা না করে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য পরিচিত কিছু গানের তালিকা দেয়া হলো —

বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে (ভৈরবী)

তিমির বিদারী অলখ বিহারী

চম্পা পারুল যুথী টগর চামেলা

গগনে কৃষ্ণ মেঘ দোলে ( কাজরী)

সখী বাধোলো বাধোলো ঝুলনিয়া

শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে

পিয়া পিয়া পিয়া পাপিয়া পুকারে

নহে নহে প্রিয় এ নয় আঁখি জল (দূর্গা, বিলাবল ঠাটে )

যাবার বেলায় ফেলে যেও একটি খোঁপার ফুল

দূর আজানে র মধুরধ্বনি বাজে

আমায় নহে গো ভালবাসো শুধু

আমি যদি আরব হতাম মদিনারই

মসজিদের পাশে আমার কবর দিও

তোমার হাতের সোনার রাখী (ভৈরবী)

প্রিয় এমন রাত যেন যায় না বৃথাই

খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু

ও কালো শশী রে, বাজায়ো না

হে পার্থ সারথি, বাজাও বাজাও

হে মদিনা বাসী ধর হাত মম

রিমি রিমঝিম ঐ নামিল দেয়া

জনম জনম গেলো (বাগেশ্রী)....

বলি মা তোর চরণ ধরে

বড় সংকটে পড়িয়া দয়াল

বল স্বরূপ কোথা আমার সাধের প্যারী

ভক্তির দ্বারে বাঁধা আছেন সাঁই

সব লোকে কয় লালন কী জাত

এমন মানব জনম আর কী হবে

কাল কাটালি কালের বশে

মন তুই করিলি এ কী ইতরপনা

এসব দেখি কানার হাট বাজার.....

কাহারবা তালে রবীন্দ্রসংগীত
প্রায় ৪৫৩টি রবীন্দ্রসংগীত কাহারবায় নিবদ্ধ আছে। উল্লেখযোগ্য কিছু গানের তালিকা দেয়া হলো—

আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায়

আজ খেলা ভাঙার খেলা

আজ কি তাহার বারতা পেল রে কিশলয়

আজি যত তারা তব আকাশে

আকাশ জুড়ে শুনিনু ঐ বাজে

আমার অঙ্গে অঙ্গে কে বাজায়

আমার যাবার বেলায়

আমার যে দিন ভেসে গেছে

আমার সকল দুঃখের প্রদীপ জ্বেলে

আমার শেষ পাড়ানির কড়ি

আমি মারের সাগর পাড়ি দেব

অয়ি ভুবনমনমোহিনী, মা

বাদল বাউল বাজায় রে

বাজিল কাহার বীণা

ভালবেসে যদি সুখ নাহি

বনে যদি ফুটল কুসুম

চৈত্রপবনে মম চিত্তবনে

ছায়া ঘনাইছে বনে বনে

দারুণ অগ্নিবাণে রে

দে তোরা আমায় নুতন ( মায়ার খেলা)

দিয়ে গেনু বসন্তের

দই চাই গো দই চাই (চণ্ডালিকা)

এ আভরণ ক্ষয় হবে গো

এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে

এই তো ভালো লেগেছিল

এসো হে বৈশাখ

এত আলো জ্বালিয়েছ

গ্রাম ছাড়া ওই রাঙামাটির পথ

হে ক্ষণিকের অতিথি

জাগরণে যায় বিভাবরী

যদি জানতেম আমার কীসের ব্যথা

কেন চেয়ে আছো গো মা

কেটেছে একেলা বিরহের বেলা

খর বায়ু বয় বেগে

কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ

মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন

মায়াবনবিহারিনী হরিণী

মন মোর মেঘের সঙ্গী

মনে রবে কি না রবে আমারে

মোর বীণা ওঠে কোন সুরে বাজি

ওই মালতিলতা দোলে

ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল

ফাগুনের নবীন আনন্দে

রূপসাগরে ডুব দিয়েছি

সেদিন দুজনে দুলেছিনু

শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে

শুভ কর্মপথে ধর নির্ভয়

তোমার খোলা হাওয়া....
বাঙলা আধুনিক + চলচ্চিত্রের গানে কাহারবা

পাগল মন মনরে, মন কেন এত কথা বলে

ও শ্যামরে তোমার সনে

ওরে নীল দরিয়া আমায় দেরে

আমি তোমারি প্রেম ভিখারী

ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে

ইস্টিশনের রেলগাড়িটা

ভাওয়াইয়া

ওকি গাড়িয়াল ভাই

ও মোর কালা রে

বাউকুমটা বাতাস যেমন

দিনে দিনে খসিয়া পড়িবে

ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে

ভাটিয়ালি....

সর্বনাশা পদ্মা নদী

কলকল ছলছল নদী করে টলমল

পল্লীগীতি

আমায় এত রাতে কেনে ডাক দিলি

আমার হাড় কালা করলাম রে...

কীর্তন

ভজ গৌরাঙ্গ কহ গৌরাঙ্গ

প্রভাত সময়ে শচীর আঙিনা মাঝে

জয় রাধে জয় রাধে গোবিন্দ...
কাহারবা তালে অন্যান্য জনপ্রিয় গান

হলুদিয়া পাখি সোনার ররণ

ভ্রমর কইয়ো গিয়া,

সোনার ময়না পাখি, কোন দোষেতে

আমি কেমন করে পত্র লিখিরে বন্ধু

এত রাতে কেন ডাক দিলি প্রাণ কোকিলা রে

আমি কুলহারা কলঙ্কিনী

কোন বা পথে নিতাইগঞ্জ যাই

বুড়ি হইলাম তোর কারণে

আমি ফুল বন্ধু ফুলের ভ্রমরা

যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম

এই যে দুনিয়া কীসের লাগিয়া

গুরুপদে প্রেম ভক্তি হলো না মন

গুরু উপায় বলো না

আমার হাড় কালা করলাম রে

নাতি খাতি বেলা গেল শুতি পারলাম না

ওকি গাড়িয়াল ভাই

বাউকুমটা বাতাস যেমন

মাঝি বাইয়া যাওরে

আমায় ভাসাইলি রে আমায় ডুবাইলি রে

কলকল ছল ছল নদী করে টলমল

সর্বনাশা পদ্মা নদী

ভালোবাসার মত ভালবাসলে তারে কি গো ভোলা যায়

কাহারবার কয়েকটি প্রচলিত বোল:

+ ০
ধাˈ গেˈ তেˈ টে । নাˈ কˈ ধিˈ নাˈ ।।
১ ২ ৩ ৪ ৫ ৬ ৭ ৮
+ ০
ধা গে না তি । না ক ধি না ।।
১ ২ ৩ ৪ ৫ ৬ ৭ ৮
+ ০
ধা ধিন্ না ধিন্ । না তিন্ নানা কেনে ।।
১ ২ ৩ ৪ ৫ ৬ ৭ ৮
৪//
+ ০
ধিগ্ ধিন্ নাক্ ধিন্ । নাক্ তিন্ নানা কেনে ।।
১ ২ ৩ ৪ ৫ ৬ ৭ ৮
৫//
দ্রুত কাহারবা
+ ০
ধি ন ধা ধা । তি ট ধা ধা ।
১ ২ ৩ ৪ ৫ ৬ ৭ ৮
এসব বোল ছাড়াও গান অনুযায়ী, কাহারবা বাজানোর আরও অসংখ্য পদ্ধতি আছে। যেমন, রবীন্দ্রসঙ্গীতে চার মাত্রায় নিবদ্ধ তালের আরও দুটি প্রকরণ ব্যবহৃত হয়। এ দুটি তালও কাহারবা নামে চিহ্নিত হয়ে থাকে। তাল দুটি হলো―
১) চতুর্মাত্রিক তাল (২।২ ছন্দ)
২) চতুর্মাত্রিক তাল (অবিভাজিত)।
এছাড়াও শ্রীখোলে কীর্তনের জন্য কাহারবার বিভিন্ন স্বতন্ত্র রূপ ও বোল আছে।
(ফেসবুক পোস্ট থেকে)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন